চৌহালীতে সমবায় সমিতির আড়ালে জুয়ার টাকা ‘বৈধ’ করছেন জসিম – Sirajganj Times

চৌহালীতে সমবায় সমিতির আড়ালে জুয়ার টাকা ‘বৈধ’ করছেন জসিম

জসিম মাহমুদ।- ছবি: সংগৃহীত

কয়েক বছর আগেও ছিল ছোট একটি মোবাইল মেরামতের দোকান। এরপর অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ। অল্প সময়ের ব্যবধানে বদলে যায় জীবনযাত্রা। একের পর এক ব্যবসা, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন সিরাজগঞ্জের চৌহালীর জসিম মাহমুদ।

অনলাইন জুয়া থেকে বিপুল অর্থ আয়ের অভিযোগের পর এবার তাঁর অর্থের গতিপথ নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, জুয়া থেকে পাওয়া অর্থ সরাসরি ব্যবহার না করে সমবায় সমিতি, দাদন ব্যবসা ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করছেন জসিম। এতে জুয়ার অর্থের উৎস আড়াল করে বৈধ ব্যবসার টাকা হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

মোবাইলের দোকান থেকে কোটি টাকার সম্পদ

চৌহালীর খাষপুখুরিয়া ইউনিয়নে কয়েক বছর আগেও মোবাইল মেরামতের ছোট একটি দোকান চালাতেন জসিম। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘মাস্টার এজেন্ট’ হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপরই দ্রুত বদলাতে থাকে তাঁর আর্থিক অবস্থান। স্থানীয়দের কাছে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার দাবি রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের নাগরপুরে জসিমের মোবাইল ও জুতার শোরুম রয়েছে। ঢাকায় রয়েছে ফ্ল্যাট। ধামরাইয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি রয়েছে বলেও দাবি তাদের। চৌহালীতেও প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছেন একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। প্রশ্ন উঠছে এই সম্পদের অর্থের উৎস কী?

সমবায় সমিতির আড়ালে জুয়ার টাকা ‘বৈধ’ করার পথ

জসিমের অর্থের ব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সমবায় সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন করছেন। তাদের অভিযোগ, অনলাইন জুয়া থেকে পাওয়া অর্থ সরাসরি নিজের নামে বা পরিচিত ব্যবসায় ব্যবহার না করে সমবায় সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হচ্ছে। পরে সেই অর্থ ব্যবসা ও দাদন কারবারে খাটানো হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এতে অর্থের মূল উৎস আড়াল করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ জুয়া থেকে আসা টাকা সরাসরি ব্যবহারের বদলে সেটি বিভিন্ন হাত ঘুরে ব্যবসার মূলধন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

দাদন ব্যবসাতেও কি ঢুকছে জুয়ার টাকা?

শুধু সমবায় সমিতি নয়, জসিমের বিরুদ্ধে দাদন ব্যবসার মাধ্যমেও অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগেও জসিমের তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। এখন তাঁর কোটি কোটি টাকার সম্পদ। তাঁর সহযোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনও অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চৌহালী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকার অনলাইন জুয়াড়িদের সঙ্গে একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে জসিমের।

সম্পদ বাড়ল কীভাবে?

একজন ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধি নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়। কিন্তু আয় ও সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে তার উৎস যাচাই করা জরুরি। জসিমের ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্নই সামনে আসছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে বাড়ি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, শোরুম ও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পেছনে অর্থের উৎস কী? তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

আরও পড়ুন: অনলাইন জুয়ায় ভর করে কোটিপতি চৌহালীর মোবাইল টেকনিশিয়ান জসিম

ভাইয়ের বক্তব্যে মিলল জুয়ার সম্পৃক্ততার কথা

এর আগে জসিমের অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন তাঁর বড় ভাই ও খাষপুখুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য আমগীর হোসেন। তিনি দাবি করেন, স্মার্টফোন ব্যবহারকারী সবাই জুয়ার সঙ্গে জড়িত। তাঁর ভাই দ্রুত আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করায় মানুষ হিংসার বশবর্তী হয়ে এসব অভিযোগ করছে।

জসিমের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আমগীর হোসেন বলেন, তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন। এমনকি পরিবারের সদস্যরাও সহজে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। তবে জুয়ার অর্থ সমবায় সমিতির মাধ্যমে ব্যবহার, দাদন ব্যবসা এবং বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আমগীর হোসেন জানেন না কিছু।

জসিমের বক্তব্য কী?

এর আগে গেল, ২৬ আগস্ট ‘অনলাইন জুয়ায় ভর করে কোটিপতি চৌহালীর মোবাইল টেকনিশিয়ান জসিম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিরাজগঞ্জ টাইমস। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সিরাজগঞ্জ টাইমসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জসিম মাহমুদ। এ সময় অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। জসিম বলেন, অতীতে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি আর সেই পথে নেই। জসিমের দাবি, বর্তমানে তিনি আমদানি করা পণ্যের ব্যবসা করেন। তাঁর বর্তমান আয়ের উৎস এই ব্যবসা থেকেই আসে বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মত

অর্থনীতিবিদ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন ব্যবসা, সমবায় সমিতি কিংবা দাদন কারবারে বিনিয়োগ করা হলে অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করার সুযোগ তৈরি হয়। এতে অবৈধ অর্থ বৈধ আয়ের মতো দেখানোর ঝুঁকি থাকে। তাই কারও সম্পদ অল্প সময়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তাঁর আয়, ব্যবসায়িক লেনদেন ও সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়ার অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং কোন পথে তা বিভিন্ন ব্যবসায় ঢুকছে সেটিও দুদকের হস্তক্ষেপে তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

 

সিরাজগঞ্জ টাইমস/এএস/সিই