প্রায় দেড় যুগ ধরে অব্যাহত যমুনার নদীভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা। ২১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনে হারিয়ে গেছে থানা ভবন, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসাসহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে হাজারো বসতভিটা, কৃষিজমি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদীশাসন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই ভাঙনের ভয়াবহতা বাড়ছে। ২০১৫ সালে উপজেলা সদর রক্ষায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করা হলেও গত ১০ বছরে সেটি ১৫ বারের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি তাদের। এছাড়া উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকা এখনো অরক্ষিত থাকায় খাষপুখুরিয়া, বাঘুটিয়া ও উমারপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
নদীভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিতে এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রউফ বলেন, “সরকারি কর্মকর্তারা বারবার পরিদর্শনে আসেন, আশ্বাসও দেন। কিন্তু ৫০ বছরেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।”

৩৫ হাজার মানুষের আশ্রয় তিন গ্রামে। ছবি: প্রতিবেদক
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নগুলোর একটি বাঘুটিয়া। একসময় নয়টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এ ইউনিয়নে এখন টিকে আছে মাত্র তিনটি গ্রাম। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবুল সরকার জানান, অবশিষ্ট তিনটি গ্রামেই প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের বসবাস। পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া গ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও এখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে চলতি বর্ষাতেই ইউনিয়নের অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাষপুখুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, ভাঙনের কারণে একের পর এক গ্রাম বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে বারবার বসতি পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে। সরকারি স্থাপনা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলো পুনর্নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
চলতি বর্ষা মৌসুমে যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার অন্তত ১০টি এলাকায় নতুন করে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। গত ১৫ দিনে অর্ধশতাধিক বসতভিটা, ফসলি জমি ও একটি মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে সম্ভূদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, সম্ভূদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সম্ভূদিয়া আজিজিয়া আলিম সিনিয়র মাদ্রাসা, মঞ্জুর কাদের মহাবিদ্যালয়, বিনানই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পয়লা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, পয়লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ প্রায় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ঝুঁকিতে রয়েছে কবরস্থান, বাজার ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়।
বর্তমানে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানই, চরসলিমাবাদ, ভুতের মোড় ও চর নাকালিয়া, খাষপুখুরিয়া ইউনিয়নের শাকপাল এবং ঘোড়জান ইউনিয়নের ফুলহারা, মুরাদপুর ও কড়িতলাসহ অন্তত ১০টি গ্রাম ভাঙনের কবলে রয়েছে।

পানি বাড়ার সঙ্গে শুরু হয় তীব্র ভাঙন।- ছবি: প্রতিবেদক
গত ২৬ জুন আকস্মিক ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা। ক্ষতিগ্রস্তদের ভাষ্য, আকস্মিক ভাঙনের কারণে ঘরের কোনো মালামালও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাদের দাবি, ত্রাণ নয়—স্থায়ী ও পরিকল্পিত বেড়িবাঁধই পারে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে।
চৌহালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফকির জুয়েল রানা বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এতে বড় ধরনের ভাঙনের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাঙনকবলিত এলাকার কাছাকাছি বালু উত্তোলনের কারণেও পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। স্থানীয় শিক্ষার্থী সায়মন বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও কিছু জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল মিলছে না।”
চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নূরুল আমিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ করছে। উপজেলা প্রশাসনও নিয়মিত তদারকি করছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সোখলেছুর রহমান বলেন, ভাঙন এলাকার কাছ থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ সঠিক নয়। নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখেই জিওব্যাগে বালু ভরাট করা হচ্ছে। তিনি জানান, ফ্রেমিপ (FRERMIP) প্রকল্পের আওতায় চৌহালীতে চার কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে রয়েছে এবং এটি অনুমোদনের অপেক্ষায়।
সিরাজগঞ্জ টাইমস/আইএইচএ/সিই











